আমার ভারতবর্ষ
গতকাল GD Diabetic Centre -এর ঠিক উল্টোদিকের ফুটপাথে চাউমিনের দোকানে দাঁড়িয়ে হাফপ্লেট চাউমিন খাচ্ছিলাম।
খাওয়া শেষ করে এঁটো প্লেটটা কোথায় রাখবো জিজ্ঞেস করতেই একটা ছোট্ট রোগা কালো হাত এগিয়ে এসে চুপচাপ এঁটো প্লেটটা নিয়ে নিলো।
প্লেটটা এগিয়ে দিতে গিয়েই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। হাতটার সঙ্গে কোথাও একটা ঋদ্ধির, মানে আমার কন্যার হাতের অদ্ভুত মিল আছে মনে হল । একই বয়স, একই কোমলতা, শুধু ভাগ্যের ব্যবধানটা অনেকখানি।
হঠাৎ করেই দুটো লজেন্স কিনে পুঁচকেটার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিলাম। সে কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইলো।
কাজ সেরে বাড়ি ফিরলাম। কিন্তু সারাটা পথ, সারাটা সন্ধ্যা, মন জুড়ে রয়ে গেল সেই পলকা একজোড়া হাত…। এমন হাত, যেগুলো খেলনা ধরার কথা ছিল, বইয়ের পাতা ওল্টানোর কথা ছিল, আঁকিবুঁকি করার কথা ছিল, সেগুলোই কিনা এঁটো প্লেট তুলে নেয় রোজ।
আজ আবার গেলুম সেই দোকানে, দেখবো সেই পুঁচকেটাকে। কিন্তু তিনি দোকানে ছিলেন না। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করতেই সে একটু হেসে ডেকে দিল ‘গণেশ’কে।
সামনেই ফুটপাথে, Kathleen দোকানটার ঠিক উল্টোদিকে, পলিথিন আর ছেঁড়া ত্রিপলের নিচেই তার সাজানো সংসার।
জানলাম, সে তালতলা হাইস্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। যেদিন দোকানে কাজ থাকে না, সেদিন সে স্কুলে যায়। কি আশ্চর্য এই দেশ! এখানে স্কুলে যাওয়ার দিন ঠিক হয় কাজের অবসরের দিন দেখে ।
আমি একটু অবাক হয়েই তাকে বললাম,
“রোল খাবি?”
সে মাথা নাড়ল। সেই ছোট্ট ঘাড়ের নেতিবাচক নাড়ানোটা যেন এক বিশাল আত্মসম্মানের ঘোষণা।
একমুখ হেসে বললো,
“এই তো ডাল আলুভাতে দিয়ে ভাত খেলাম।”
গণেশের মুখে এমন এক তৃপ্তি, যা শহরের বড় বড় নামি-দামি রেস্তোরাঁয় খেয়ে ওঠা মানুষের মুখে সচরাচর দেখা যায়না। তারপর আমার দেওয়া একটা ক্রিম বিস্কুট নিয়ে বসে পড়ল।
আবার জিজ্ঞেস করলাম,
“পেন পেন্সিল খাতা কিছু লাগবে?”
গণেশ মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল
“এখন সব আছে। কিছুই লাগবে না। দরকার না লাগলে কিনতে নেই।”
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। গণেশের ধারণা নেই, সে কী বিরাট দর্শনের কথা বলে ফেলল। আজকের পৃথিবীতে যেখানে বিজ্ঞাপন মানুষকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে শেখায়, যেখানে লোভ আর ভোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে ফুটপাথের এই ছোট্ট ছেলেটা বলে কিনা 'দরকার না লাগলে কিনতে নেই।'
ভাবতে অবাক লাগে, সমাজবিজ্ঞানের কত বই, অর্থনীতির কত তত্ত্ব, পরিবেশ রক্ষার কত বক্তৃতা, সব মিলিয়েও যে কথাটা মানুষ শিখতে পারে না, সেটাই জীবন তাকে খুব ছোটবেলাতেই শিখিয়ে দিয়েছে।
দারিদ্র্য শুধু অভাব শেখায় না, কখনও কখনও তা মানুষকে অপ্রয়োজনের বিরুদ্ধে এক গভীর সংযমও শেখায় বোধহয় ।
আমাদের দেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার গণেশ আছে। তাদের অনেকেই ফুটপাথে বড় হয়, দোকানে কাজ করে, বাসন মাজার ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে যায়; অনেক গণেশরা কখনও স্কুলে যাওয়ার সুযোগই পায়না হয়ত।
রাষ্ট্রের পরিসংখ্যান বলবে এরা ‘child labour’, সমাজবিজ্ঞান বলবে এরা ‘marginalised class’, নীতি-নির্ধারকেরা বলবে এদের জন্য সরকারি স্কিম রয়েছে।
কিন্তু ফুটপাথের এই বাস্তব জীবনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই শিশুরা আসলে আমাদের সমাজের ঘষে যাওয়া আয়না। আমরা যেখানে অকারণে কিনি,
তারা সেখানে প্রয়োজন বুঝে বাঁচে। আমরা যেখানে অতিরিক্ত চাই, সেখানে তারা সামান্য পেয়েও তৃপ্ত হয়।
গণেশের মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে এলাম। দূর থেকে হেসে আমাকে 'টা টা' করল আমার এক বিলুপ্তপ্রায় নির্লোভ ভারতবর্ষ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল আজ যেন আমি শুধু একটা শিশুর সঙ্গে দেখা করলাম না, আমি যেন স্পর্শ করে এলাম এক বিলুপ্তপ্রায় সময়কে।
কাল আবার যাব ওর কাছে। ওকে আরও একবার ছুঁয়ে দেখতে।
