জ্ঞান বিজ্ঞান

মরুগোলাপের কথা

মহঃ হাসানুজ্জামান
মহঃ হাসানুজ্জামান 16 May, 2026
৫৮২

সারা গায়ে তার খোদাই করা ভাস্কর্য। অসংখ্য বিমূর্ত কারুকার্যে মোড়া গোটা দেহ। নধর, রসালো শরীর জুড়ে যেন কোনো বেখেয়ালি শিল্পীর নিঃসঙ্গ দুপুরের গোপন নকশা। এই অদ্ভুত মোটা, শৈল্পিক কাণ্ডকেই বলে ক্যাডেক্স। 

      আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপের রুক্ষ, শুষ্ক প্রান্তরের আদিবাসী এরা। প্রকৃতি নিজেই যেন তাদের শরীরে জল সঞ্চয়ের অলৌকিক ক্ষমতা এঁকে দিয়েছে। তাই দহনময় উষ্ণতা, খরাপ্রবণ মরুভূমি কিংবা দীর্ঘ অনাবৃষ্টি, কিছুই তাদের ভয় দেখাতে পারে না। বরং প্রখর রোদ আর গরমই এদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ঋতু।

      বলছিলাম মরু গোলাপের কথা। আফ্রিকান বাওবাবের ক্ষুদ্র সংস্করণের মতো দেখতে এই আশ্চর্য উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাডেনিয়াম।

     ভাস্কর্যের মতো খোদাই করা কাণ্ড, অদ্ভুত শিকড়ের গঠন আর থোকা থোকা কিংবা একক ট্রাম্পেট আকৃতির ফুলের অনিন্দ্য সৌন্দর্য সব মিলিয়ে অ্যাডেনিয়াম আজ উদ্যানপালক ও বনসাইপ্রেমীদের কাছে এক দুর্নিবার আকর্ষণের নাম। আশ্চর্যের বিষয়, এত সৌন্দর্যের পরেও পরিচর্যায় ক্ষেত্রে এরা বিশেষ মনোযোগের দাবী করে না।

      অ্যাডেনিয়ামের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রজাতি হলো অ্যাডেনিয়াম ওবেসাম।

      প্রচণ্ড খরা আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও দিব্যি টিকে থাকতে পারে এই গাছ। প্রায় যত্নহীন একটি অ্যাডেনিয়ামও কয়েক দশক ধরে বেঁচে থাকতে পারে।  বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কাণ্ড আরো মোটা হয়, বাকল আরো রুক্ষ হয়, আর সে ধীরে ধীরে যেন জীবন্ত এক ভাস্কর্যে পরিণত হয়।

      চওড়া, অগভীর টবে বীজ কিংবা কাটিং দুভাবেই লাগানো যায় এই গাছ। মার্চ-এপ্রিল মাস অ্যাডেনিয়াম লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ১:১:১ অনুপাতে মাটি, লাল বালি এবং গোবর বা কেঁচো সারের মিশ্রণ এদের জন্য আদর্শ। তবে একটি বিষয় সবসময় মনে রাখতে হবে এই গাছ জল একেবারেই সহ্য করতে পারে না। অতিরিক্ত জল তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই মাটি শুকিয়ে না গেলে জল না দেওয়াই শ্রেয়।

     দিনে সাত-আট ঘণ্টা প্রত্যক্ষ রোদ অ্যাডেনিয়ামকে প্রাণবন্ত করে তোলে। রোদের ভিতরেই যেন সে তার মরুভূমির অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

      গাছটি বড় হয়ে ডালপালা ছড়াতে শুরু করলে প্রথম কাজ হবে তাকে ছাঁটাই করে একটি সুবিন্যস্ত কাঠামো দেওয়া। গাছটির উচ্চতা, বিস্তার কিংবা ভবিষ্যতের শিল্পিত রূপ অনেকটাই নির্ভর করে এই ছাঁটাইয়ের উপর। 

      কাণ্ড থেকে বের হওয়া শাখাগুলিকে তিন থেকে পাঁচ ইঞ্চি রেখে কেটে দিতে হবে। কাণ্ডের ছোট ছোট নোডগুলিকে চিনে নিয়ে নিজের কল্পনামতো গঠন তৈরি করে নিতে হবে। কারণ সেখান থেকেই আবার নতুন শাখা জন্ম নেবে।

      ছাঁটাইয়ের পরে ক্ষতস্থানে সামান্য দারুচিনি গুঁড়ো লাগিয়ে দেওয়া ভালো। এটি প্রাকৃতিক ছত্রাকনাশকের কাজ করে। আর মনে রাখা প্রয়োজন, ছাঁটাইয়ের পর কয়েকদিন গাছে একেবারেই যাতে জল না দেওয়া হয়। এতে কাটা অংশ দ্রুত শুকিয়ে সেরে উঠবে।

      ছাঁটাইয়ের সময় অবশ্যই হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা জরুরী। অ্যাডেনিয়ামের ক্ষত থেকে বের হওয়া সাদা দুধের মতো রসে কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড নামের একধরনের টক্সিন থাকে, যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

      মার্চ থেকে অক্টোবর- দীর্ঘ সময় জুড়ে এই গাছে অসংখ্য ফুল ফোটে। উষ্ণ আবহাওয়ায় কখনও কখনও প্রায় সারা বছরই ফুলে ঢাকা থাকে গাছটি। পাঁচ পাপড়ি বা ডাবল পাপড়ির ট্রাম্পেট আকৃতির ফুলগুলি যেন মরুভূমির বুক জুড়ে হঠাৎ ফুটে ওঠা কোনো রঙিন স্বপ্ন।

      গাছটি বয়সে বড় হলে ধীরে ধীরে তার শিকড় শক্ত হয়, কাণ্ডে মোটা বাকল জমে ওঠে। তখন মাটির নীচে থাকা কিছু শিকড় সামান্য উন্মুক্ত করে দিলে সেই শিকড়গুলিও গাছের ভাস্কর্যময় সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে প্রাচীন মরুভূমির সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণু স্থাপত্যের মত। 

      আইকনিক ক্যাডেক্স, অনিন্দ্য সুন্দর ফুল, দেহজুড়ে ভাস্কর্যের আবহ আর মরুভূমির আদিম অস্তিত্ব নিয়ে অ্যাডেনিয়াম কেবল একটি গাছ নয়  যেন আপনার টেবলটপে দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো সুররিয়াল শিল্পকর্ম।

      একবার ভালোবেসে ফেললে এই মরু গোলাপ ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে পারে আপনার নিঃসঙ্গ দুপুর, রৌদ্রভেজা বারান্দা আর ব্যক্তিগত নান্দনিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মহঃ হাসানুজ্জামান

মহঃ হাসানুজ্জামান

দ্য স্ক্রল এর একজন নিয়মিত লেখক এবং বিশ্লেষক।